সবকিছুকে ভুলে গিয়ে পূর্ণ মনযোগে কাজ করার উপায়:

সবকিছুকে ভুলে গিয়ে পূর্ণ মনযোগে কাজ করার উপায়:

31 May, 2019

সবকিছুকে ভুলে গিয়ে পূর্ণ মনযোগে কাজ করার উপায়



ডিপ ওয়ার্ক আসলে কাদের জন্য?
# যাঁরা নিজেদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে চান, বিশেষ করে রিসার্চ ওয়ার্কের সাথে জড়িতরা।
# যাঁরা অল্প সময়ে অনেক বেশি কাজ করতে চান।
# যাঁরা মাল্টিটাস্কিং বা বহুকর্ম, মনযোগ, এবং কর্মদক্ষতার ব্যাপারে আগ্রহী।
—————————-
০১. ডিপ ওয়ার্ক বা গভীরতাপূর্ণ কাজ আসলে কি?
—————————-
# ডিপ ওয়ার্ক বা গভীরতাপূর্ণ কাজ:
“অন্য কোনও দিকে কোনওরকম মনযোগ দেয়া ছাড়া পূর্ণ মনযোগে এক সময়ে একটি মাত্র কাজ করা। এভাবে কাজ করাটা আপনার মানসিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে। এতে প্রায়ই নতুন কিছু সৃষ্টি হয় যা মানুষের কাজে লাগে। সেই সাথে এই ধরনের কাজে আপনার দক্ষতা বাড়বে, এবং এটা রপ্ত করা আসলেই কঠিন”।
# শ্যালো ওয়ার্ক (Shallow Work) বা ‘ভোঁতা কাজ’:
এই ধরনের কাজে খুব বেশি জ্ঞান বা বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। সাধারনত যন্ত্রপাতি বা ঐ ধরনের কিছুর সাহায্যে করা হয়, এবং প্রায়ই এই কাজগুলো অমনযোগোর সাথে করা হয়। এই ধরনের কাজ গুলো পৃথিবীকে নতুন কার্যকর কিছু দিতে পারে না, আর এগুলো রপ্ত করাও খুব বেশি কঠিন কিছু নয়।
লেখক নিউপোর্ট এই দুই ধরনের কাজের মাঝে বেশকিছু পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর চোখে গভীরতা পূর্ণ কাজ হলো এমন কাজ যাতে আপনি এক ধ্যানে পূর্ণ মনযোগের সাথে লেগে থাকেন, এগুলো অল্প সময়ে অনেক বেশি কার্যকর ফলাফল সৃষ্টি করে, এবং, আগেই বলা হয়েছে, এই কাজ গুলো সবার পক্ষে রপ্ত করা কঠিন।
অন্যদিকে ভোঁতা কাজ বা Shallow Work এ কর্মীর খুব বেশি মনযোগ থাকে না। এগুলো তেমন কোনও কঠিন বা সৃষ্টিশীল কাজও নয়। লেখকের মতে প্রতি দশ মিনিটে একবার করে মেইল চেক করা, নোটিফিকেশনে ক্লিক করে দেখা, অথবা ফেসবুক, টুইটার, নিউজ সাইট/পেপার এ সময় কাটানোর মতো অর্থহীন কাজগুলো প্রধানত এর মধ্যে পড়ে।
বইটির তত্ব অনুযায়ী, বর্তমানে গভীরতাপূর্ণ কাজ করার ক্ষমতা মানুষের মাঝে দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং এর ফলে একই সময়ে এই ক্ষমতা বা দক্ষতাটির মূল্য দারুন ভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এই কারনে যে অল্প কিছু মানুষ এই দক্ষতাটি অর্জন ও চর্চা করতে পারছে বা পারবে, তাদের জীবন দারুন ভাবে সফল হবে।
বিজনেস এক্সপার্ট ও বেস্ট সেলিং লেখক এরিক বারকার এর মতে গভীরতার সাথে কাজ করার দক্ষতাটি নি:সন্দেহে ২১ শতকের সুপার পাওয়ার।
০২. গভীরতাপূর্ণ কাজ কেন দুর্লভ, কিন্তু সেইসাথে অতি মূল্যবান?
——————————————————–
আগের পয়েন্টেই বলা হয়েছে – গভীরতাপূর্ণ কাজের দক্ষতা দিনে দিনে একটি দুর্লভ বস্তুতে পরিনত হওয়ার পাশাপাশি এর মূল্যও দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে। – কিন্তু এর কারন কি? – চলুন একে একে বিষয় দু’টি নিয়ে আলোচনা করা যাক।
# গভীরতাপূর্ণ কাজ কেন দুর্লভ হয়ে পড়ছে?
প্রথম কথা, ভোঁতা কাজ বা Shallow Work বেশ সহজ। সেইসাথে আপাতদৃষ্টিতে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই ভোঁতা কাজকে উ‌ৎসাহিত করে বলে মনে হয়। ভেবে দেখুন: প্রতিনিয়ত কর্মীদের ওপর নজরদারী করা, দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তাগাদা দেওয়া, বা ওপেন অফিস প্ল্যান (আলাদা আলাদা রুমের বদলে একটি বড় স্পেস নিয়ে খোলা জায়গায় ডেস্ক বসানো, এবং সবাইকে একসাথে কাজ করতে দেয়া, এই পদ্ধতিতে কর্মীরা সার্বক্ষণিক নজরদারীতে থাকে)। এইসব পদ্ধতিতে যেসব প্রতিষ্ঠান চলে, সেগুলোর কর্মীরা দায়সারা ভাবে কোনওরকমে কাজ শেষ করতে পারলে বাঁচে। কাজের জন্য কাজ না করে এরা ‘দেখানোর জন্য’ কাজ করে থাকে। আর বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো আগের বলা পদ্ধতিতেই বেশি চলে।
লেখক নিউপোর্টের মতে, আজকালকার বেশিরভাগ কর্মীই ‘ব্যস্ততা দেখাতে চায়’, অন্য কথায় তারা সত্যিকার কাজের ফলাফলের বদলে ব্যস্ততা দেখানোকে বেছে নেয়। যাতে করে উর্ধ্বতনরা বুঝতে পারে যে সে অনেক কাজ করছে। সত্যিকার ফলপ্রসূ কাজ করা বলতে আসলে কি বোঝায় – এই বিষয়ে পরিস্কার কোনও নির্দেশনা না থাকার ফলে অনেক সৃষ্টিশীল, এবং তথ্য ও গবেষণাভিত্তিক কাজের কর্মীরাও পন্যভিত্তিক কর্মীদের মত কাজ করতে শুরু করে দেয়। অর্থা‌ৎ তারা শুধুমাত্র দেখানোর জন্য অনেক বেশি কাজ করে। উর্ধ্বতনরাও বুঝতে পারেন না যে তাঁদের কর্মীরা যতটা ব্যস্ততা বা কাজ দেখাচ্ছেন, ততটা কাজ আসলে হচ্ছে না। আর এই কারনে এই সহজ পদ্ধতিতে পার পাওয়ার কৌশলটি দিনে দিনে কর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আর সেইসাথে সত্যিকার গভীরতাপূর্ণ কাজ করার দক্ষতা, ও সেই দক্ষতাসম্পন্ন মানুষও দুর্লভ হয়ে পড়ছে।
# গভীরতাপূর্ণ কাজ কেন মূল্যবান?
অল্প কথায় বলতে গেলে, গভীর ভাবে কাজ করলে যে কোনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ফলাফলটি বের করে আনা যায়।
এবং এর পেছনের কারনটি খুবই সাধারন। “ডিপ ওয়ার্ক একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় ধরে একটি মাত্র কাজ কোনও রকমের বিঘ্ন ছাড়া, গভীর মনযোগের সাথে করা হয়”। – এভাবে কাজ করলে মোট চারটি বিষয় আপনার কাজের সর্বোচ্চ ফলাফল এনে দিতে সহায়তা করবে। চলুন এই চারটি বিষয় সংক্ষিপ্ত আকারে বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক:
** একটি মাত্র কাজ করা:
অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেই এটা প্রমাণিত হয়েছে যে একই সময়ে অনেক কাজ করা, বা Multitasking কর্মদক্ষতা কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, একটি সময়ে একটি মাত্র কাজে মনযোগ দিলে কাজের দক্ষতা ও ফলাফলের পরিমান অনেক বেড়ে যায়।
Image result for multitasking
** কোনওরকম বিঘ্ন ছাড়া কাজ করা:
এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। একটি কাজ করার সময়ে যদি মাঝখানে কোনও রকমের বিঘ্ন, যেমন- ফোন আসা, নোটিফিকেশনে ক্লিক করা, কারও সাথে গল্প করা – ইত্যাদি না ঘটে, তাহলে অবশ্যই আপনার কাজ আরও ভাল হতে বাধ্য।
** গভীর মনযোগ:
আপনি যদি আপনার সমস্ত মনযোগ একটি নির্দিষ্ট কাজের ওপর রাখতে পারেন, তবে আপনি অনেক কম সময়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারবেন। আপনার মনযোগ যত গভীর হবে, আপনার কাজের ফলাফলও ততই ভাল হবে।
** একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় ধরে কাজ করা:
একটি নির্দিষ্ট ও লম্বা সময় ধরে কাজ করার বেশ কিছু সুফল রয়েছে। এই ব্যাপারটি আমরা ৩ নম্বর পয়েন্টে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

০৩. অবশিষ্ট থেকে সাবধান!
—————————-
নিউপোর্ট তাঁর বইতে লিখেছেন- “আপনি যখন কাজ A থেকে কাজ B তে যাবেন, আপনার মনযোগ সাথে সাথে স্থানান্তর হবে না। আপনার চিন্তার কিছু অবশিষ্ট অংশ আগের কাজটি নিয়ে তখনও ভাবতে থাকবে। এই অবশিষ্ট অংশ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে যখন আগের কাজটি তখনও অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থাতেই আপনি অন্য কাজে মন দেন। তবে আপনি যদি নতুন কাজে আসার আগে আগের কাজটি শেষও করে আসেন, কিছু সময়ের জন্য আপনার মনযোগ বিভক্ত থাকে”।
“বিভক্ত মনযোগ নিয়ে কাজ করার অভ্যাসটি বেশ ভালভাবে আপনার পারফর্মেন্স এ বিরূপ প্রভাব ফেলে। মনে হতে পারে যে কাজের মাঝে মাঝে দুই-একবার এক-দুই মিনিটের জন্য ইনবক্সে নজর বুলানো তেমন ক্ষতিকর কিছু নয়। অনেকের মতে সারাদিন মনিটরের এক কোণে ইনবক্সটি ওপেন করে রাখার চেয়ে এটা করা ভাল। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে এই দুইয়ের মাঝে তেমন কোনও পার্থক্য নেই।
এই দুই-এক মিনিট, এমনকি সেকেন্ড অমনযোগী হওয়াটাও আপনার মনযোগ নষ্ট করবে। এই ‘কুইক চেক’ আপনার মনযোগকে একটি নতুন টার্গেট ঠিক করে দেয়। আরও খারাপ বিষয় হলো, আপনি যখন অল্প একটু সময়ের জন্য কোনও মেসেজ চেক করেন, প্রায়ই দেখা যায় সেগুলোর উত্তর দেয়ার সময় আপনার হাতে থাকে না। এর ফলে কাজটি শুরু করে অসমাপ্ত রেখেই আরেকটি কাজে মনযোগ দিতে হয় – এতে করে আপনার মূল কাজটিতেও আপনার পূর্ণ মনযোগ নষ্ট হয়ে যায়”।
কোনও কাজের মাঝে থাকা অবস্থায় যখন আপনি বারবার অল্প সময়ের জন্য অন্যদিকে মনযোগ দেন, একটু একটু করে মূল কাজের ‘productivity’ কমতে থাকে।
আর এই আগের কাজের অবশিষ্টের ফাঁদে পড়া এড়াতে একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে ‘ডিপ ওয়ার্ক’ বা গভীর ভাবে কাজ করার কোনও বিকল্প নেই।
নিউপোর্ট তাঁর বইয়ে এই বিষয়ে একটি গবেষণার উল্লেখ করেছেন, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা একটি ওয়ার্ড পাজ্‌ল সেট মেলানো দিয়ে তাদের কাজ শুরু করেছিল। এরপর একটি ধাপে তাদের পাজ্‌ল মেলানো শেষ হওয়ার আগেই তাদের অন্য একটি কাজ করতে বলা হয়, যা ছিল বেশকিছু সিভি বা বায়োডাটা দেখে কাল্পনিক একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মী নির্বাচন করা। অন্য একটি ধাপে অংশগ্রহনকারীদের বলা হয়েছিল প্রথমে পাজ্‌ল মেলানো শেষ করে তারপর যেন তারা কর্মী নির্বাচনের খেলাটি খেলে। দুই কাজর মাঝে তাদের আগের কাজের চিন্তা কতটা প্রভাব রাখছে, তা বুঝতে গবেষকরা পাজ্‌ল ও কর্মী নির্বাচন গেমের মাঝে আরও একটি ডিসিশন মেকিং ঘরানার গেম রেখেছিলেন।
সেই রিচার্চের রিপোর্টে বলা হয়েছিল: “যেসব ক্ষেত্রে একজন মানুষ আগের কাজটি অসমাপ্ত রেখে আরেকটি কাজে নামে, অথবা আগের কাজের চিন্তা মাথায় নিয়ে নতুন কাজে নামে – সেসব ক্ষেত্রে পরের কাজটিতে তার পারফর্মেন্স ও কাজের ফলাফল খুবই নিন্মমানের হয়”।
আপনি যদি কোনও কাজে আপনার পূর্ণ দক্ষতা ব্যবহার করে সেরা ফলাফলটি বের করে আনতে চান, তবে একটি নির্দিষ্ট ও দীর্ঘ সময় ধরে সেই একটি মাত্র কাজ, নির্বিঘ্নে পূর্ণ মনযোগের সাথে করুন। অন্য কথায়, গভীরতার সাথে কাজ করুন।
০৪. গভীরতাপূর্ণ কাজ একটি অনন্য দক্ষতা
——————————————————–
 “ডিপ ওয়ার্ক এর অভ্যাসটি ভালভাবে রপ্ত করে সেরা কাজটি বের করে আনার জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। আর এই প্রশিক্ষণ বা ট্রেইনিং এর লক্ষ্য হতে হবে দুইটি: গভীর ভাবে মনযোগ দেয়ার দক্ষতা অর্জন করা, এবং মনযোগ নষ্টকারী বিষয়গুলোর দিকে খেয়াল করার প্রবনতাকে জয় করা”।
 গভীর ভাবে কাজ করার দক্ষতা অর্জন করতে হলে তা দীর্ঘ সময় ধরে যত্নের সাথে অনুশীলন করতে হবে। নতুন কেউ যদি ডিপ ওয়ার্ক অনুশীলন করা শুরু করে তবে তার সেই কাজের গভীরতা প্রথমেই অনেক মাস বা বছর ধরে গভীরতাপূর্ণ কাজ করা একজনের সমান হবে না, নতুন শুরু করে এটা রপ্ত হতে বেশ কিছুটা সময় প্রয়োজন।
অর্থা‌ৎ গভীরতাপূর্ণ কাজের দক্ষতা অর্জন করতে হলে নিয়মিত ও দীর্ঘ অনুশীলন প্রয়োজন। আপনি যদি এখন থেকে এই দক্ষতাটি অনুশীলন শুরু করেন, তবে এখনই দীর্ঘ সময় ধরে মনযোগ ধরে রাখার আশা না করাই ভাল। প্রথম দিকে হয়তো প্রতিদিন এক কি দুই ঘন্টা ‘ডিপ ওয়ার্ক’ করা আপনার ক্ষমতায় কূলাবে। কিন্তু যদি এটা চালিয়ে যান, তবে ধীরে ধীরে একটা সময়ে আপনি এই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বিশাল পরিমানের কাজ করে ফেলতে পারবেন। শুধু ধৈর্য না হারিয়ে, হতাশ না হয়ে আপনাকে কাজটি চালিয়ে যেতে হবে – দক্ষতাটি আপনা আপনিই একটা সময়ে আপনার অভ্যাসে পরিনত হবে।
নিউপোর্টের মতে ডিপ ওয়ার্কের মূল দুই ভিত্তি হচ্ছে ভয়াবহ ভাবে একটি বিষয়ে মনযোগ দেয়ার ক্ষমতা, ও আশপাশ থেকে আসা বা নিজের ভেতরে সৃষ্টি হওয়া মনযোগ নষ্টকারী বিঘ্নগুলোকে অগ্রাহ্য করতে পারার মানসিক দৃঢ়তা। এই দুইটি দক্ষতা মিলেই বলতে গেলে গভীরতাপূর্ণ কাজের দক্ষতার জন্ম দেয়।
দ্বিতীয় অংশ: ডিপ ওয়ার্ক রপ্ত করা ও কাজে লাগানো যায় কিভাবে?
০৫. ডিপ ওয়ার্কের চারটি মূল বিধিবিধান
——————————————————–
ডিপ ওয়ার্ক কতটা মূল্যবান এবং কিভাবে কাজ করে এগুলো জানা, এবং জেনে অনুপ্রাণিত হওয়াটা খুব সহজ একটি কাজ। কিন্তু কঠিন কাজটি হচ্ছে বাস্তবে এটি করে দেখানো। কেন? – কারন আমাদের স্বভাবই হচ্ছে বিভিন্ন দিকে মনযোগ দেয়া। মাল্টিটাস্কিং বা বহুকর্ম আমাদের চুম্বকের মত আকর্ষণ করে।
কিভাবে ডিপ ওয়ার্ককে আমরা আমাদের জীবনে কাজে লাগিয়ে স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি কাজ করতে পারি। 
#১: গভীর ভাবে কাজ করুন
#২: একঘেয়েমিকে আপন করে নিন
#৩: সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করুন
#৪: ভোঁতা কাজকে দূরে রাখুন
চলুন একে একে এই চারটি বিধান সম্পর্কে সংক্ষেপে বিস্তারিত জেনে নিই:
#১: গভীর ভাবে কাজ করুন:
গভীর ভাবে কাজ করাটা বেশ কষ্টসাধ্য হওয়ায় আমরা সাধারনত এভাবে কাজ করতে চাই না। এর সাথে যোগ হয় বর্তমান সময়ের কাজের পরিবেশ আর প্রতিনিয়ত চারপাশ থেকে আসা বিভিন্ন বিঘ্ন। যার ফলে গভীর ভাবে কাজ করাটা আজকাল খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে, এবং ভোঁতা কাজ করার প্রতি আমাদের ঝোঁক দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। গভীর ভাবে কাজ করাকে যদি দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিনত করতে হয়, তবে সেজন্য আমাদের বিশেষ প্রক্রিয়া ও রুটিন তৈরী করে নিতে হবে – যাতে করে আপনাআপনিই এই অভ্যাসটির চর্চা করা যায়। সেটা কিভাবে করবেন, তা পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।
#২: একঘেয়েমিকে আপন করে নিন:
আগেই বলা হয়েছে, গভীর মনযোগ এমন একটি দক্ষতা – যা অর্জন করতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। সেরা এ্যাথলেট বা খেলোয়াড়রা যেমন তাঁদের অনুশীলন সেশনের বাইরেও নিজেদের শরীরের যত্ন নেন, আপনাকেও আপনার ডিপ ওয়ার্ক সেশনের বাইরেও গভীর মনযোগের চর্চাটি চালিয়ে যেতে হবে। যদি আপনি দৈনন্দিন জীবনে সব বিষয়ে একটু একঘেয়ে লাগলেই অন্যদিকে মনযোগ দেন, (যেমন কাজ করতে করতে বোরিং বা একঘেয়ে লাগলে একটু ফেসবুক চেক করা, সিনেমা বা টিভি সিরিজের অংশবিশেষ দেখা, বা খেলার স্কোরটি চেক করা) – তাহলে গভীরতাপূর্ণ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মন সংযোগের দক্ষতা অর্জন করা আপনার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
তারচেয়েও ভয়ের কথা, এভাবে চলতে থাকলে আপনি আপনার মস্তিষ্ককে ঠিক উল্টো পথে প্রশিক্ষিত করে ফেলবেন। অর্থা‌ৎ মন একটু একঘেয়ে বোধ করলেই আপনি মনযোগ নষ্টকারী বিষয়ের দিকে সব সময়ে নজর দেবেন। এরপর আপনি কোনও একটি বিশেষ কাজে পুরো মনযোগ দিতে চাইলেও আপনার মনযোগ অন্যদিকে চলে যাবে। কারন অন্যান্য সময়ে এটা করতে করতে আপনার মস্তিষ্ক এতেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে।
যদি সমাধানের কথা জিজ্ঞাসা করেন, তো সমাধান একটাই: একঘেয়েমিকে আপন করে নিন। সুযোগ পেলেই ইনবক্স, সোশ্যাল মিডিয়া বা স্মার্টফোন চেক করা থেকে বিরত থাকুন। কোনও কাজের মাঝে পাঁচ-দশ মিনিটের ব্রেক পেলেও এই কাজগুলো করবেন না। এইসব মনযোগ নষ্টকারী বিষয়ের আকর্ষণ থেকে দূরে থাকতে ব্রেনকে ট্রেইন করুন। ধীরে ধীরে দেখবেন, কাজের মাঝেও এটা আর আপনার মনযোগকে নষ্ট করছে না। বোরিং বা একঘেয়ে লাগলে দরকার পড়লে একটু হাঁটাহাঁটি করুন। চোখ বন্ধ করে বসে থাকুন। কিন্তু অন্যকিছুতে ব্যস্ত হবেন না – এক মিনিটের জন্যও নয়। একঘেয়েমিকে আপন করে নিয়ে কাজের মাঝে থাকুন – একটা সময়ে দেখবেন আপনি ব্যাপারটা উপভোগ করতে শুরু করেছেন।
#৩: সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করুন:
বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া হচ্ছে ‘ভোঁতা জীবন’ (Shallow Living) এর সবচেয়ে বড় উদাহরন।  যদিও এটা আমাদের জীবনে অল্প কিছু ভাল অবদান রাখে, কিন্তু তা এটার পেছনে আমরা যতটা সময় নষ্ট করি – তা কখনওই এটার প্রাপ্য নয়। যদি সব সময়ে আপনার মাথার ভেতর ‘দুই মিনিটের জন্য’ সোশ্যাল প্রোফাইল চেক করার তাগাদা থাকে, তবে আপনি কখনওই গভীর ভাবে কাজ করতে পারবেন না। সত্যি বলতে সোশ্যাল মিডিয়া একটি ভয়ানক নেশা, আর নেশা এবং গভীরতাপূর্ণ কাজ কখনওই একে অপরের পাশাপাশি চলতে পারে না। কাজেই আপনার কাছে আপনার কাজ যদি অতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে যতটা পারুন দূরে থাকুন।
আগেই বলা হয়েছে, ভোঁতা কাজ বা Shallow Work হলো এমন কাজ যেগুলো করতে খুব বেশি বুদ্ধি খরচ করতে হয় না, কিন্তু সেগুলো দারুন ভাবে মানুষকে আকর্ষণ করে। ফোনে কথা বলা, মেইল ও মেসেজ চেক করা ও সেগুলোর উত্তর দেয়া, মিটিং করা – এবং এই ধরনের অনেক কম গূরুত্বপূর্ণ ও অ-সৃষ্টিশীল কাজ এই ঘরানায় পড়ে।
আপনি যদি সত্যিই চান যে আপনি গভীরতার সাথে কাজ করবেন, তবে এইসব ভোঁতা কাজকে দূরে সরাতে হবে। জীবন থেকে বলতে গেলে এদের অস্তিত্ব ‘নেই’ করে দিতে হবে। অন্তত দিনের একটা সময় আপনাকে রাখতে হবে যখন এগুলোর কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। ধীরে ধীরে সেই সময়ের পরিধি বাড়াতে হবে। আপনাকে একটি রুটিনে চলে আসতে হবে, এবং সেই রুটিনের মাঝে এই ভোঁতা কাজগুলো যতটা কম থাকে ততই ভাল। আর আপনি যখন গভীরতাপূর্ণ কাজের চর্চা করবেন – তখন যেন কোনওভাবেই কোনও বিঘ্ন না ঘটে। ফোনকল, নোটিফিকেশন, মেসেজ – ইত্যাদি যেন আপনাকে বিরক্ত না করতে পারে।
০৬. গভীরতাপূর্ণ কাজকে অভ্যাসে পরিনত করার জন্য রুটিনের ব্যবহার করুন
——————————————————————–
এই ব্যাপারে নিউপোর্ট তাঁর বইতে লিখেছেন – “গভীরতাপূর্ণ কাজের অভ্যাস সৃষ্টি করার মূল চাবিকাঠি হলো, শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছার ওপর নির্ভর না করে আপনার কর্মজীবন গভীরতাপূর্ণ কাজের অনুকূল একটি রুটিনে বেঁধে ফেলা। এর ফলে গভীর ও অখন্ড মনযোগ সৃষ্টির জন্য সাধারনভাবে যতটা ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করা প্রয়োজন তারচেয়ে কম ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন পড়বে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: ধরুন আপনি কোনও এক অলস বিকেলে ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে করতে হঠা‌ৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলেন যে আপনি এখন পূর্ণ মনযোগে একটি সৃষ্টিশীল ও বুদ্ধিদিপ্ত কাজে হাত দেবেন। এখন ওয়েব ব্রাউজিং এর মজা থেকে আপনার মনযোগকে সত্যিকার একটি কাজের দিকে নিয়ে আসতে আপনাকে অনেক বেশি ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু এই ধরনের প্রচেষ্টা সাধারনত ব্যর্থ হয়। (এর কারন এই নয় যে আপনার ইচ্ছাশক্তি দুর্বল, এর কারন আপনার অভ্যাস।) অন্যদিকে আপনি যদি কার্যকর একটি রুটিন সৃষ্টি করেন – এটা হতে পারে প্রতি বিকেলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, একটি নির্দিষ্ট স্থানে আপনি গভীরতাপূর্ণ কাজ করবেন – তাহলে এই কাজটি শুরু করা ও চালিয়ে নেয়ার জন্য আপনাকে খুব বেশি ইচ্ছাশক্তি খাটাতে হবে না। ধীরে ধীরে এই অভ্যাসটি আপনি আরও বেশি সময় ধরে এবং আরও ঘন ঘন চর্চা করতে পারবেন”।
বর্তমান যুগের পরিবেশ পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত আমাদের ভোঁতা কাজ করতে উ‌ৎসাহিত করে, আর নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি খাটানোটা মানসিক ভাবে কষ্টকর ও পরিশ্রমসাধ্য ব্যাপার – তাই এর মাঝে গভীর ভাবে কাজ করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এই দক্ষতাটি অর্জন করতে হলে আমাদের অবশ্যই ব্যাপারটিকে একটি রুটিনের মাঝে নিয়ে আসতে হবে। রুটিনে আনার ফলে কিছুদিনের মধ্যেই সেই নির্দিষ্ট সময়ে গভীরতাপূর্ণ কাজের জন্য আমাদের খুব বেশি ইচ্ছাশক্তি খরচ করতে হবে না। একটু একটু করে এটি আমাদের অভ্যাসে পরিনত হবে।
নিউপোর্টের মতে, চারটি পদ্ধতিতে আমরা ডিপ ওয়ার্ক করার জন্য রুটিন তৈরী করতে পারি। যেমনটা আগেই বলা হয়েছে, একবারে পুরোটা করতে গেলে তার জন্য প্রচুর ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন, এবং তা কষ্টসাধ্য। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে অভ্যাসটি দীর্ঘ সময়ের জন্য আপনার মাঝে টিঁকে থাকবে না। তাই একটি রুটিনের মাধ্যমে অনুশীলন করলে ডিপ ওয়ার্ক আপনার স্থায়ী একটি অভ্যাসে পরিনত হবে। নিচে চারটি পদ্ধতি সংক্ষেপে বর্ণনা করছি, এর যে কোনও একটি আপনি নিজের জন্য বেছে নিতে পারেন।

#১: সন্ন্যাস পদ্ধতি:
দরবেশ বা সন্ন্যাসীরা যেমন আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য সমাজ থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে চলে যান, এই পদ্ধতিও তেমনই। দিনের বা সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আপনি সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে গভীর ভাবে নিজের কাজ করবেন।
#২: যৌগিক পদ্ধতি:
এই পদ্ধতিতে সাধারন জীবনের সাথে সন্ন্যাস পদ্ধতির মিশ্রিত ব্যবহার করা হয়। উদাহরন হিসেবে বলা যায় প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কাল ইয়ুঙ এর কথা। তিনি তাঁর সাধারন চিকি‌ৎসা, গবেষণা ও সামাজিক মেলামেশার জন্য জুরিখে অবস্থান করতেন। কিন্তু তিনি তাঁর বই লেখার কাজ করতেন লোকালয় থেকে দূরে তাঁর অন্য একটি বাড়িতে।
#৩: ছন্দ পদ্ধতি:
এই পদ্ধতিতে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়, যেমন ভোর ৫টা থেকে সকাল ৭টা, বা সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি দিন, যেমন শুক্রবার বা রবিবার আপনাকে গভীরতাপূর্ণ কাজ অনুশীলনের জন্য রাখতে হবে। এবং এই ছন্দে কোনওপ্রকার বিঘ্ন আসতে দেয়া যাবে না। এভাবে করতে পারলে একটা সময়ে চাইলেই এভাবে কাজ করার অভ্যাস তৈরী হয়ে যাবে।
#৪: সংবাদকর্মী পদ্ধতি:
সব সাংবাদিক যে সব সময়েই তাঁর কাজে ব্যস্ত থাকেন – তা নয়। কোন সময়ে তাঁদের কোন এ্যাসাইনমেন্ট এসে পড়ে, তা বলা বেশ শক্ত। কিন্তু একজন দক্ষ সাংবাদিক, যখনই এ্যাসাইনমেন্ট আসে তখনই পূর্ণ মনযোগে সেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন।
লেখক নিউপোর্ট নিজেও এই পদ্ধতিতে কাজ করেন। তিনি কাজের গুরুত্বের ভিত্তিতে সেটি তাঁর দিনের পরিকল্পনার মাঝে রাখেন, এবং যখন প্রয়োজন হয় গভীরতাপূর্ণ কাজের মাধ্যমে কাজটি করেন।
এই চারটি পদ্ধতির যেটি আপনার পক্ষে সবচেয়ে সুবিধাজনক হয়, আপনি সেটিকেই বেছে নিতে পারেন। এর যে কোনও একটির নিয়মিত অনুশীলন করলে আপনি আপনার কাঙ্খিত দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
০৭. সবচেয়ে জরুরী বিষয়গুলোতে আগে নজর দিন
——————————————————–
“4 Disciplines of Execution” বইয়ের উদাহরন টেনে নিউপোর্ট লিখেছেন – “ ‘আপনি যত বেশি করার চেষ্টা করবে, সত্যিকার অর্থে ততই কম কাজ আপনি শেষ করতে পারবেন’। – আপনার লক্ষ্য থাকতে হবে অল্প সংখ্যক অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এভাবে লক্ষ্যস্থির করতে পারলে তা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মনযোগ দেয়ার ক্ষমতার গন্ডির মধ্যে থাকবে এবং সত্যিকার অর্থেই ভাল ফলাফল বেরিয়ে আসবে”।
“একজন মানুষকে ডিপ ওয়ার্কে পূর্ণ মনযোগ দিতে হলে, তাকে ডিপ ওয়ার্ক করার সময়টাতে অল্প সংখ্যক অতি জরুরী কাজে মননিবেশ করতে হবে। সাধারন ভাবে আমরা যা করি, অর্থা‌ৎ অনেক বেশি সময় ধরে গভীর ভাবে কাজ করতে চাওয়া, তা খুব বেশি আগ্রহের জন্ম দেয় না। ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি ‘Art of Focus’ শিরোনামের কলামে ডেভিড ব্রুকস্ অতি জরুরী লক্ষ্য কিভাবে মনযোগকে চাঙ্গা করে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছিলেন: ‘আপনি যদি মনযোগ দেয়ার যুদ্ধে জিততে চান তবে অজস্র তথ্যের মাঝ থেকে সাধারন ভাবে সামনে আসা বিঘ্নগুলোকে ‘না’ বলার চেষ্টা করবেন না। বরং চেষ্টা করুন এগুলোর মধ্য থেকে যে বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করছে, সেটিকে ‘হ্যাঁ’ বলার। এবং সেই আকর্ষণের বিষয়টিকে অন্য সব কিছুকে অস্পষ্ট করে ফেলতে দিন”।
শুধু ‘না’ বলার খাতিরে বিঘ্নগুলোকে ‘না’ বলাটা খুব একটা উ‌ৎসাহজনক নয়। অন্যদিকে কোনও একটি বড় লক্ষ্য অর্জন করার খাতিরে অন্য সব বিঘ্নকে ‘না’ বলাটা অনেক বেশি উ‌ৎসাহজনক।
যদি সেই অতি জরুরী লক্ষ্যটিকে পূরণ করার ক্ষেত্রে ‘ফেসবুক’ বিঘ্ন হয়ে দাঁড়ায় – তবে ফেসবুককে না বলাটা বেশ একটা উত্তেজনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। আপনার সামনে যদি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য থাকে, এবং আপনি সেই লক্ষ্যের গুরুত্ব সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারেন, তবে বিঘ্নগুলোকে ‘না’ বলাটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
এখানে একটি প্রশ্ন চলেই আসে, ‘অতি জরুরী লক্ষ্যটি আসলে কি?’, ‘কোন বিষয়টি আপনার মাঝে একটি দুর্বার আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে?’ – এটা খুঁজে বের করা আপনার দায়িত্ব। খুঁজে বের করুন, কোন লক্ষটি অর্জন করা আপনার জন্য সবচেয়ে জরুরী? সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আপনাকে কোন কোন কাজ করতে হবে? কোন কাজের পরে কোন কাজটি আসবে? – এই প্রশ্নগুলো নিয়ে খুব গভীর ভাবে ভাবুন – তারপর গভীর ভাবে সেগুলো নিয়ে কাজ শুরু করুন। একবার শুরু করার পর বিঘ্নগুলোর প্রতি যতটা সম্ভব কম নজর দেয়ার চেষ্টা করুন।
০৮. কৌশলগত বা পরিকল্পিত আলস্য
——————————————————–
 দশকের পর দশক ধরে হয়ে আসা মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার আলাদা আলাদা গবেষণার ফলাফল একটি সিদ্ধান্তের দিকেই ইঙ্গিত করে যে নিয়মিত ভাবে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়াটা গভীরতাপূর্ণ কাজের ক্ষমতাকে উন্নত করে। আপনি যখন পরিশ্রম করবেন, তখন কঠোর পরিশ্রম করবেন; যখন কাজ শেষ, তার মানে কিছু সময়ের জন্য হলেও শেষ”।
কাল নিউপোর্ট এর মতে, আপনার দিনের রুটিনে যথেষ্ট পরিমান ‘পরিকল্পিত আলস্যের’ জায়গা রাখুন। এই পরিকল্পিত আলস্য বা বিশ্রাম, সত্যিকার অর্থে গভীরতাপূর্ণ কাজের জন্য জরুরী।
এই কথার পেছনে তিনি তিনটি যুক্তি দিয়েছেন:
#১. বিশ্রাম গভীর ভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উদ্ধার করতে সহায়তা করে:
গভীরতাপূর্ণ কাজের সময়ে যে ধরনের মনযোগ দেয়া হয়, তার একটা সীমা আছে। সেই মনযোগ দেয়ার শক্তি ফিরে পেতে মাঝে মাঝে শরীর-মনকে বিশ্রাম দিতে হবে।
#২. বিশ্রামের সময়ে বিশ্রাম বাদ দিয়ে আমরা যে কাজ করি, তা সাধারনত অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়:
সাধারন ভাবে, একজন মানুষের গভীরতাপূর্ণ কাজ করার ক্ষমতা দিনে দুই-চার ঘন্টার বেশি হয় না। সেই সময়টা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আপনি যে কাজ করেন, তা খুব একটা ভাল ফলাফল দিতে পারে না, কাজেই তা তেমন একটা গুরুত্ব বহন করে না।
#৩. বিশ্রামের বা অলস সময়টাতে অবচেতন মন বেশি ভাল কাজ করে:
মনস্তাত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, কিছু কিছু জটিল সিদ্ধান্ত আমাদের অবচেতন মন চেতন মনের চেয়ে ভালভাবে নিতে পারে। বিশ্রাম ও কর্মহীন সময় চলাকালে আমাদের অবচেতন মন বেশি ত‌ৎপর হয়ে ওঠে – এর ফলে অনেক সময়ে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান, ও কঠিন বিষয়ে সিদ্ধান্ত চটজলদি সামনে চলে আসে।
একটি ব্যাপার মনে রাখবেন, অলস সময় বা বিশ্রাম বলতে এখানে লেখক ভোঁতা কাজে ফিরে যাওয়াকে বোঝাননি। এই সময়টা ফেসবুক – ইত্যাদিতে মনযোগ না দিয়ে অল্প করে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারেন, একটু হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, বাস্তব জীবনে কোনও বন্ধু বা আপনজনের সাথে গল্প করতে পারেন, সন্তানদের সাথে সময় কাটাতে পারেন, চোখ বুঁজে প্রিয় গান শুনতে পারেন, একটু শরীরচর্চা করতে পারেন। এতে করে সবদিক দিয়েই আপনার ভাল হবে।
এটা করার জন্য কাল নিউপোর্ট তাঁর বইয়ে একটি উপায়ের কথা বলেছেন, যার নাম তিনি দিয়েছেন: “Shutdown Ritual” – মানে সবকিছু বন্ধ করে দেয়ার অভ্যাস। আপনার দিনের কাজ শেষ হয়ে গেলে মাথা থেকে সব কাজের চিন্তা দূর করে দিন। রাতের খাওয়ার পর কোনও ই-মেইল চেক করতে যাবেন না, সারাদিনে কার সাথে কি কথা হলো – সেগুলো নিয়ে চিন্তা করতে যাবেন না, এবং কালকের দিনের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে পরিকল্পনা করতে যাবেন না। তার মানে এই না যে এগুলো একদমই করবেন না। এগুলো করার জন্য আলাদা সময় রাখুন। কাজগুলো Shutdown Ritual শুরুর আগেই সেরে ফেলুন। তারপর কাজ নিয়ে চিন্তা করাই বন্ধ করে দিন।
নিউপোর্ট তাঁর দিনের কাজ সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার মধ্যে শেষ করে ফেলেন, এবং তিনি বলতে গেলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কোনও কাজই করেন না। কিন্তু এতটা অল্প সময় কাজ করেও তিনি এরমধ্যেই বেশ কয়েকটি বেস্ট সেলিং বই লিখে ফেলেছেন, প্রতি বছর তিনি একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন – সেইসাথে আরও অনেক কিছুই করেন। বহু মানুষ তাঁর চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ পরিশ্রম করেও এতটা সাফল্য পান না।
ব্যাপারটা হচ্ছে, কাজের সাফল্য ও সন্তোষজনক ফলাফল কতটা বেশি সময় ধরে কাজ করা হলো- তার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে আপনি যতক্ষণ কাজ করছেন সেই সময়ের পুরোটা পূর্ণভাবে কাজে লাগানো, এবং যেই সময়টা কাজ করছেন তার পূর্ণ সদ্ব্যবহারের ওপর।
০৯. রুজভেল্ট পদ্ধতিতে কম সময়ে বেশি কাজ শেষ করুন
——————————————————–
একটা কথা হয়তো আপনিও অনেকবার শুনেছেন: Hard Work এর চেয়ে Smart Work এর মাধ্যমে বেশি সাফল্য পাওয়া যায়।
নিউপোর্ট তাঁর বইয়ে লিখেছেন: “রুজভেল্ট (সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট) পদ্ধতিতে কাজ করতে হলে আপনাকে দিনের মাঝে মধ্যে রুজভেল্ট এর মত প্রবল ভাবে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। নির্দিষ্ট করে বললে, আপনার দিনের কাজের মাঝে এমন একটি কাজ খুঁজে বের করুন যার জন্য আপনার গভীর ভাবে কাজ করার প্রয়োজন পড়বে, এবং যা করাটা আপনার জন্য বেশ জরুরী। এখন ভেবে বের করুন সেটা করতে সাধারন ভাবে আপনার কতটা সময় প্রয়োজন। এরপর সেই সময়ের থেকে অনেকটা কমিয়ে একটি কঠোর ডেডলাইন ঠিক করুন। আপনার ফোনে, কম্পিউটারে, বা ঘড়িতে একটি টাইমার সেট করুন। টাইমারটি এমন জায়গায় রাখুন যেন কাজের সময়ে তা কখনওই চোখের আড়াল না হয়”।
ওপরে বর্ণিত রুজভেল্ট পদ্ধতি আসলে আমেরিকার ২৬তম প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এর পড়াশুনা করার পদ্ধতি থেকে অনুপ্রাণিত। এটি কর্মক্ষেত্রে ডিপ ওয়ার্কের সংমিশ্রণ ঘটানোর একটি সহজ পদ্ধতি। এই পদ্ধতি মেনে কাজ করলে আপনার অন্যদিকে মনযোগ দেয়ার কোনও সুযোগই থাকে না। কারন, ডেডলাইন গুলো হয় বেশ ছোট এবং এই কারনে আপনার মনযোগও থাকে পূর্ণমাত্রায়। এভাবে কাজ করতে থাকলে বিঘ্নের প্রতি মনযোগ দেয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে নেই হয়ে যাবে। এবং আপনি একটা সময়ে মনযোগ দেয়ার দারুন দক্ষতা অর্জন করবেন।
১০. গভীরতাপূর্ণ জীবন (পরিশিষ্ট)
—————————-
“সত্যি বলতে, গভীরতাপূর্ণ জীবন সবার জন্য নয়। কারন এটি অর্জন করতে কঠোর পরিশ্রম ও অভ্যাসের অভূতপূর্ব পরিবর্তন করা প্রয়োজন হয়। অনেকের ক্ষেত্রেই প্রচুর পরিমান ই-মেইল করা, এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে নিয়মিত কাজ করাটা দারুন প্রশান্তির বিষয়। কিন্তু গভীরতাপূর্ণ জীবনে প্রবেশ করতে হলে এসবকে অনেকটাই পেছনে ফেলে আসতে হয়। 
@Tanbir Ahmad

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *